২৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গলফ ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে থাকবে। সেদিন জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশনের (বিজিএফ) নির্বাহী কমিটির প্রথম নির্বাচন। ধীরে ধীরে এগিয়ে চলা এই খেলাটির জন্য এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এটি দেশের গলফের অভিভাবক প্রতিষ্ঠানটির জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক মাইলফলক।
বাংলাদেশে গলফের বিকাশ দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বতন্ত্র কাঠামোর মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। অন্যান্য অনেক খেলার তুলনায় এ দেশের গলফের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্পর্ক গভীর। দেশের বেশির ভাগ গলফ কোর্সই ক্যান্টনমেন্ট এলাকার ভেতরে অবস্থিত। কুর্মিটোলা, ভাটিয়ারি, সাভার, রংপুর কিংবা ময়নামতী—এই সব কোর্সকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের গলফ সংস্কৃতি। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে এই খেলাকে এগিয়ে নিতে অবকাঠামোর ভিত্তি তৈরি করেছে—যেখানে আর্থিক লাভের বিষয়টি কখনোই মুখ্য হয়ে ওঠেনি।
নবনির্বাচিত বিজিএফ নির্বাহী কমিটির সামনে এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে ভবিষ্যতের দৃষ্টিভঙ্গির সমন্বয় ঘটানোই হবে তাদের প্রধান দায়িত্ব। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কেউই নতুন নন; তাঁরা প্রত্যেকেই দীর্ঘদিন ধরে গলফের সঙ্গে যুক্ত, অভিজ্ঞ সংগঠক এবং এই খেলাটির নিবেদিত পৃষ্ঠপোষক। তাঁদের অভিজ্ঞতা স্বাভাবিকভাবেই আশাবাদ তৈরি করে।
এই নেতৃত্বের কেন্দ্রে রয়েছেন বাংলাদেশ গলফ ফেডারেশনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি গলফকে এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট আগ্রহ দেখিয়েছেন। বিভিন্ন গলফ ক্লাবের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা, তরুণ খেলোয়াড়দের উৎসাহ দেওয়া এবং গলফ কমিউনিটিকে দিকনির্দেশনা দেওয়ার বিষয়গুলো ইতিমধ্যেই প্রশংসিত হয়েছে।
সম্প্রতি তিনি বলেছেন, “যুবসমাজ যদি খেলাধুলার সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে তারা বিপথে যাবে না।” এই বক্তব্য খেলাধুলার সামাজিক গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। গলফ এমন একটি খেলা, যা শৃঙ্খলা, ধৈর্য এবং পারস্পরিক সম্মান শেখায়—যার প্রভাব মাঠের বাইরেও বিস্তৃত। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের গলফের ভবিষ্যৎ জাতীয় যুব উন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলোর সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বিজিএফের সিনিয়র সহসভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল শাহীনুল হক। তিনি দীর্ঘদিনের একজন অভিজ্ঞ গলফার এবং বাংলাদেশের গলফ অঙ্গনের পরিচিত মুখ। ময়নামতী গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব, ভাটিয়ারি গলফ অ্যান্ড কান্ট্রি ক্লাব, সাভার গলফ ক্লাব এবং কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্ক রয়েছে। গলফের প্রতি তাঁর ভালোবাসা এবং সংগঠনিক অভিজ্ঞতা দেশের বিভিন্ন গলফ ক্লাবের মধ্যে সমন্বয় জোরদারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সহসভাপতি (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন মেজর জেনারেল মাশুদ রাযযাক (অব.). তিনি দীর্ঘদিন ধরে গলফ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এবং মাঠপর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম দিকের এশিয়ান ট্যুর আয়োজনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল উল্লেখযোগ্য। রংপুর গলফ ক্লাবের মতো নতুন কোর্স গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ প্রফেশনাল গলফার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিজিএ) সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ফলে পেশাদার গলফারদের চাহিদা ও বাস্তবতা সম্পর্কে তাঁর ধারণা গভীর।
অর্থ ও প্রশাসন বিষয়ক সহসভাপতি হিসেবে রয়েছেন হাফিজুর রহমান খান। তিনি একজন নিবেদিতপ্রাণ গলফার এবং দীর্ঘদিন ধরে গলফ টুর্নামেন্টের পৃষ্ঠপোষক। জুনিয়র, অপেশাদার এবং পেশাদার—তিন ক্ষেত্রেই তাঁর আর্থিক সহায়তা ও উৎসাহ গলফ অঙ্গনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
ফেডারেশনের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ সাইয়েদ সিদ্দিকী (অব.), যিনি নতুন করে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। এর আগে তিনি বিজিএফের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের ক্লাব ক্যাপ্টেনও ছিলেন। গলফ কমিউনিটির মধ্যে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা এবং প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ফেডারেশনের কার্যক্রমকে আরও শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।
যুগ্ম সম্পাদক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাজ্জাদ হোসেন বর্তমানে কুর্মিটোলা গলফ ক্লাবের ক্লাব ক্যাপ্টেন। বিভিন্ন গলফ ক্লাবের সঙ্গে তাঁর সক্রিয় সম্পৃক্ততা এবং খেলাটিকে এগিয়ে নেওয়ার ইতিবাচক মনোভাব তাঁকে একজন গুরুত্বপূর্ণ সংগঠকে পরিণত করেছে।
কোষাধ্যক্ষ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মামুন-উর-রশীদ চৌধুরীর গলফের সঙ্গে সম্পর্ক আরও ভিন্নধর্মী। অনেকেই তাঁকে গলফের ‘গ্রাউন্ডসম্যান’ বলে অভিহিত করেন। রংপুর গলফ ক্লাব গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভাটিয়ারি ও রংপুরসহ বিভিন্ন গলফ ক্লাবের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। বর্তমানে তিনি জলশিরি গলফ ক্লাবের টুর্নামেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
নতুন নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন নিশ্চিত করা। বাংলাদেশের গলফ ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজের সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে। সিদ্দিকুর রহমানের মতো খেলোয়াড়রা বিশ্বমঞ্চে দেশের প্রতিনিধিত্ব করে সেই সম্ভাবনাকে তুলে ধরেছেন। এখন প্রয়োজন তরুণ খেলোয়াড়দের জন্য শক্তিশালী উন্নয়ন কাঠামো তৈরি করা।
যুব উন্নয়ন এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হতে পারে। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে গলফ কর্মসূচি চালু করা গেলে নতুন প্রজন্মের মধ্যে খেলাটির প্রতি আগ্রহ বাড়বে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় মিনি গলফ বা ড্রাইভিং রেঞ্জ স্থাপন করা গেলে সাধারণ মানুষের কাছেও খেলাটি পৌঁছানো সহজ হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো গলফ সরঞ্জামের উচ্চ মূল্য। ক্লাব, বল এবং অন্যান্য সরঞ্জামের ওপর উচ্চ আমদানি শুল্ক থাকায় অনেক সম্ভাবনাময় খেলোয়াড় শুরুতেই নিরুৎসাহিত হয়। এই বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করে যদি শুল্ক কমানো যায়, তবে খেলাটির বিস্তার আরও সহজ হবে।
একই সঙ্গে নিয়মিত আন্তর্জাতিক পেশাদার টুর্নামেন্ট আয়োজনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ অতীতে এশিয়ান ট্যুরের মতো বড় প্রতিযোগিতা সফলভাবে আয়োজন করেছে। নিয়মিত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা আয়োজন করা গেলে স্থানীয় খেলোয়াড়দের প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হবে এবং একই সঙ্গে ক্রীড়া পর্যটনের সম্ভাবনাও বাড়বে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে গলফ পর্যটনকে একটি কৌশলগত খাত হিসেবে ব্যবহার করছে। বাংলাদেশেরও সুন্দর গলফ কোর্স এবং প্রাণবন্ত গলফ কমিউনিটি রয়েছে। সঠিক পরিকল্পনা ও প্রচারের মাধ্যমে এই খাতটিকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরা সম্ভব।
বাংলাদেশের গলফ কমিউনিটির অনেকের প্রত্যাশা—নবনির্বাচিত কমিটি অতীতের শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করবে। সেনাবাহিনীর অব্যাহত সহায়তা, অভিজ্ঞ নেতৃত্ব এবং কর্পোরেট ও গণমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান আগ্রহ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের গলফের ভবিষ্যৎ আশাব্যঞ্জক।
বাংলাদেশের গলফ এখন তার ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ টি-বক্সে দাঁড়িয়ে। পরবর্তী শটই নির্ধারণ করবে খেলাটি কত দূর এগোতে পারবে।
লেখক: গলফার ও দ্য গলফহাউস ম্যাগাজিনের সম্পাদক। ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠিত দ্য গলফহাউস বাংলাদেশের একমাত্র মাসিক গলফ সাময়িকী। দেশের গলফকে সবার জন্য সহজলভ্য করে তুলতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।
Leave a Reply